জয়তু মুজিব শতবর্ষ। আমিও চাই পালন করতে!

বাঙালী হিসেবে আমার প্রেরণার উৎস দু’জন। রবীন্দ্রনাথ ও শেখ মুজিব। প্রথমজনের কাছ থেকে পেলাম ভাষা আর দ্বিতীয়জনের কাছ থেকে পেলাম দেশ। ১৯৬১ সালে যখন বৈরী পরিবেশে পালিত হল রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ তখন তাকে চেনার সুযোগ ছিলো না। নিতান্তই বাল্য বয়স আমার। ২০১১ সালে ‘প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে’ উদযাপন করলাম তার সার্ধশতবর্ষ। গানে গানে, কবিতার কথায়, ভালোবাসায়। জাতির জনকের শতবর্ষের আয়োজন চলছে এখন। আমিও চাই জীবনের এই পরম সময়টাকে উদযাপন করতে। ২০৭০ সালে যখন জাতির জনকের সার্ধশতবর্ষ পালিত হবে, আমি ও আমরা অনেকেই তখন থাকবনা। এমনকি তার নাতি-নাতনিরাও তাদের জীবনের শতবর্ষের কাছাকাছি বা তারও বেশি সময় অতিক্রম করে যাবে।

Joytu Mujib Borsho - Chanchal Khan Journal

বিশিষ্ট শিল্পী তখন আমাকে বলেছিলেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতি আমি বরং আপনাকে এমন একটা ছবি এঁকে দেই যাতে শুধু মুজিবের তর্জনী দেখা যাবে আর তাঁর সামনে আবছা কিছু দিয়ে একটা এবস্ট্রাক্ট ছবি হবে। আপনি ঠিকই বুঝে নেবেন এটি মুজিবের ছবি”। আমি সেই ছবিটির ফরমায়েশ থেকে বিরত থাকি। ভদ্রলোকটি বর্তমানে একটি বিশেষ ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক বড় মাপের শিল্পী!

যখন আমাদের দুর্দিন ছিল, যখন এদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণে ছিল কঠোর বারণ, তখন অন্তত চিনতে ভুল হত না কে আমাদের শত্রু আর কে আমাদের নয়। আজ আমরা কাউকে আলাদা করতে পারিনা। সবাই বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। সবাই এক কাতারে চলে এসেছে। মনে হয় একই নদীতে হাঙর, তিমি, সাপ, তাবত ভয়ংকর প্রাণীর সাথে আমিও সাঁতার কেটে হয়রান হচ্ছি।

এখন সেই দুঃসময়ের কিছু কথা বলি। আশির দশক। আমি কাজ করতাম ঢাকায় জাতিসংঘ উনড়বয়ন কর্মসূচির দপ্তরে। আমার চেয়ারের পেছনের দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর একটি প্রতিকৃতি টাঙিয়ে ছিলাম। অনেকে আমার ঘরে ঢুকে আৎকে উঠতো। কেউ কেউ কপাল কুচকিয়ে জিজ্ঞেস করতো এটা কেনো। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম সাহেবও আসতেন। কিন্তু কোনো দিন ঐ ছবিটি ওনার নজরে পড়েছিল কিনা জানিনা। এরকম অনেকেই আসতেন। আমার বস্ ছিলেন একজন মার্কিন নাগরিক ডেভিড বেকার। ওর ঘরে আমেরিকার জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি টানানো থাকতো। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন একদিন “Why do you have to hang this picture on your wall”? আমি বললাম “It is for the same reason you have put George Washington on your wall.” এরপর আর এই বিষয়ে কথা বারে নি। ভদ্রলোকের প্রশ্নের হেতু সহজেই অনুমেয়।

ঐ একই সময়ের আরেকটি ঘটনা। আমার কাছে শিল্পী অলকেশ ঘোষের আঁকা রবীন্দ্রনাথের এক অসাধারন জীবন্ত ছবি ছিলো। আমি চাইছিলাম বঙ্গবন্ধুরও তেমনই একটা জীবন্ত ছবি আমার বাসার দেয়ালে থাকবে। গেলাম একজন প্রথিতযশা শিল্পীর কাছে। যিনি অধুনা বঙ্গবন্ধুর ভক্ত এবং বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে তার আনাগোনা। সেই বিশিষ্ট শিল্পী তখন আমাকে বলেছিলেন, “বর্তমানে যে পরিস্থিতি আমি বরং আপনাকে এমন একটা ছবি এঁকে দেই যাতে শুধু মুজিবের তর্জনী দেখা যাবে আর তাঁর সামনে আবছা কিছু দিয়ে একটা এবস্ট্রাক্ট ছবি হবে। আপনি ঠিকই বুঝে নেবেন এটি মুজিবের ছবি”। আমি সেই ছবিটির ফরমায়েশ থেকে বিরত থাকি। ভদ্রলোকটি বর্তমানে একটি বিশেষ ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক বড় মাপের শিল্পী! এই সব শিল্পী ও কিছু মেরুদন্ড ক্ষয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবী, কিছু জাতীয় অধ্যাপকবৃন্দ, প্রাক্তন ও বর্তমান আমলা ও বিশেষ করে মন্ত্রী ও এমপিদের ভীড় করতে দেখি শিল্প-সাহিত্যের আড়ালে গড়ে উঠা এই সব প্রতিষ্ঠানে। প্রতিবেশী দেশ থেকে কোটি কোটি অর্থের বিনিময়ে আসেন শিল্পীরা, সারা রাত ব্যাপী উচ্চাঙ্গ উৎসব, বই ও চিত্র প্রদর্শনী সহ কত খেলায় না মেতে উঠেন সবাই! অনেকেরই জানা থাকার কথা, বঙ্গবন্ধুর এক খুনির স্বজনরা এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। অর্থ ও উদ্বৃত্ত বিত্তের উৎস সন্ধানে কেউ মাথা ঘামায় না। জাতির জনকের শতবর্ষ উদযাপনের তথাকথিক ফাউন্ডেশনে অবশ্য নেই কোনো আয়োজন। আধ ঘন্টার জন্যও না।

এবার বলি বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে প্রবাস জীবনের আমার কিছু অভিজ্ঞতা। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ১৫ই আগষ্টের অনুষ্ঠান করেছি গুটিকয়েক জন আমরা ঘরোয়া ভাবে। দূতাবাস আমাদের জাতীয় অনুষ্ঠানে (যথা শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস) নিমন্ত্রন করত না। যদি আমাদের মুখ ফসকে হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়! ২০০২ সালে মওলানা সায়ীদি এলো মেলবোর্নে একঝাক পুরোনো ও নতুন রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতায়। হাজার হাজার বাংলাদেশী বংশদ্ভুত নাগরিকদের মাঝ থেকে দশজনের মত আমরা সায়ীদির সভাস্থলে প্রতিবাদ মিছিল করলাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে। আমাদের পক্ষে মানুষের অভাব। সিডনি থেকে এসে আমাদের দল ভারী কারলেন আরো দশ জন। ব্যাস। এই কজনই আমরা। আজকে দুর থেকে দেখি একদা চরম মুজিব বিরোধী মানুষগুলো মুজিব মুজিব করে গলা ফাটায়, পোষ্টারে, ব্যানারে ছেয়ে ফেলে চারিদিক।
জাতির পিতার শতবর্ষ পালনে ব্যস্ত দেশ। তারি মধ্যে আছে সর্ষের ভূত। এই ভূত কারা? মনে পড়ে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ঘোর দুর্দিন ‘৭৫ পরবর্তী সময়। বঙ্গবন্ধু কন্যা তখনও দেশে ফেরেননি। সে সময় যারা বঙ্গবন্ধুর নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলেন তাদের অন্যতম ওবায়দুল কাদের, নুরুল ইসলাম সুজন, অসীম কুমার উকিল, মহিউজ্জামান ময়না, কামাল চৌধুরী, জাফর ওয়াজেদ, বাহালুল মজনু চুন্নুসহ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের অনেক অকৃত্রিম কর্মী। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর বিরোধীতাকারী চীনপন্থী বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ও তথাকথিত সর্বহারা দলের নেতারা জাসদের সঙ্গে এক হয়ে ডানে বায়ে সারাক্ষন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে বেড়াতো। তারাই আজ শতবর্ষ পালনে সরব। তাদের মধ্যে কিছু শিল্পী সাহিত্যিক আছে যারা একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকও পেয়েছে। এদের ছাড়া বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, বিজয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানই পূর্ণতা পায়না। মনে হয় না বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানগুলোতে দেশের মানুষ এদের সরব উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত হবে।

আমরা এখন যারা জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসেছি, আমরা যারা একাত্তর দেখেছি, আমরা পঁচাত্তর পরবর্তী কঠিন সময় দেখেছি, আমরা যারা একাশিতে বঙ্গবন্ধু কন্যার দেশে প্রত্যাবর্তন দেখেছি তাঁদের জন্য বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী পালনের এক বিরাট সুযোগ এসেছিল। আমিও চাই বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ পালন করতে সেটা আমার মত করে, আমার একার অন্তরের অনুভূতি দিয়ে। ভিড় ঠেলতে পারবোনা, সেটার প্রয়োজন নাই। কিন্তু আমাদের চিনতে হবে সর্ষের ভেতর যে ভূতরা লুকিয়ে আছে তাদেরকে। জাতির জনকের সার্ধশতবর্ষ ২০৭০ সালে পালন করবে আমাদের নাতি-নাতনিরা। আমরা দেখবো দূর থেকে। সর্ষের ভূত ওরাই তাড়াবে।
রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই জাতির জনককে উদযাপন করছি এইভাবে:

ওই মহামানব আসে।
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে ।।
সুরলোকে বেজে উঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক।
এলো মহাজন্মের লগ্ন।
…..
জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়
মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।

মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠানে গান গাইবার যে প্রতিযোগিতা চলছে, ‘টাইটেল সং’ গাইবার যে দৌড় ঝাপ চলছে, তার কোনো প্রয়োজন নাই। “ওই মহামানব আসে”- রবীন্দ্রনাথের এই গানটিই যথেষ্ট। এই গানের মধ্যেই আমরা মুজিব শতবর্ষের মূল মন্ত্রে দিক্ষিত হতে পারি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *