ইশরাতকে দেখেছি, আবেদাকেও দেখেছি

প্রথমবার স্তব্ধ হয়েছিলাম ইশরাতের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় খুন হওয়ার সংবাদে। আবার স্তব্ধ হলাম আবেদার জঙ্গি হয়ে ওঠার সংবাদটা পড়ে। ইশরাত, যাকে আমরা বৃহত্তর পরিবারে নীলা নামেই ডাকতাম, সম্পর্কে আমার ভাগনি। আকাশের মতো খোলা মানুষটি, যে জয় করতে পারত ভয়কে। ইশরাত, অবিন্তা, ফারাজ, তারিশা, মারিয়া, ক্লডিয়া—আরও কত নাম। এরা যেন প্রাণ উপহার দিল, নিছক প্রাণ দিল না। উপহার বলছি এই কারণে, প্রত্যেক বাঙালিকে ওরা একটি দীক্ষায় আবারও ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিল, সেটা হচ্ছে আমরা মানুষ, আর আমরা বিশ্বের লোক, বিশ্বমানব। ধর্ম আমাদের ভাগ করতে পারেনি, পারবে না।

Ishrat k dekhechi - Chanchal Khan Journal

সময় এসেছে আমাদের উদ্‌ঘাটন করবার, আমাদের কাছের, চেনাজানা মানুষগুলোর কী করে সপরিবারে এ রকম পরিবর্তন হলো। ভাবছি, শুধুই ভাবছি। আমি ইশরাতকে দেখেছি, যে গুলশান হামলায় প্রাণ হারাল। আমি আবেদাকেও দেখেছি। যারা ইশরাতদের ছিনিয়ে নিল আমাদের কাছ থেকে।

আবেদার কথা বলছি! সে তো এক ‘জঙ্গির’ কাহিনি। আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে জখম নিয়ে হাসপাতালে তিনজন মহিলার একজন আবেদা, যার স্বামী তানভীর নিহত হয় ওই রাতেই। আর তাদের দুটো যমজ বাচ্চা এখন পুলিশের কাছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

আবেদাকে আমি বেশ কয়েক বছর ধরে চিনতাম। আমার অফিসে জনসংযোগ ও মিডিয়া কর্মকর্তা ছিল; পরে সেভ দ্য চিলড্রেনে চাকরিতে যোগ দেয়। আমি ছিলাম ওর একজন রেফারি। এরপর থেকে দেখা হয়নি। মাঝে মাঝে ফোন করে খোঁজখবর নিত; নিমন্ত্রণ করেছিল ওদের উত্তরায় নতুন ফ্ল্যাটটাতে। যাওয়া হয়নি। তানভীর আর আবেদার দুটো ফুটফুটে যমজ বাচ্চা। অফিসে মাঝে মধ্যে নিয়ে
এলে আমরা চকলেট দিতাম। শুনলাম পুলিশের ওপর আক্রমণে ওরাও নাকি যোগ দিয়েছিল!

এই আবেদা যে সেই আবেদা ভাবতে অবাক লাগে। পত্রিকার খবরটি বারবার পড়েছি। বিশ্বাস করা তো অসম্ভব। আবেদা গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে দারিদ্র্য বিমোচনের চমৎকার কিছু কাহিনি এনে তৈরি করত নিউজলেটার, প্রচারপত্র। মজার বিষয় হলো, মহিলাদের ক্ষমতায়নের বিষয়টি নিয়ে ভাবনা ছিল তার প্রচুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ডিগ্রি করেছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারপর থেকেই যুক্ত।

আরও বলার আছে আমার! ২০০৯ সালে আমার পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের বাল্মিকী প্রতিভা মঞ্চস্থ হয় নৃত্যাঞ্চল আর কলকাতার শিল্পীদের সঙ্গে করে। আবেদা আমার সেই কাজে সহযোগী ছিল। প্রেস রিলিজ তৈরি করে দিয়েছিল। এই অনুষ্ঠান ছাড়া আরও অনেক সৃজনশীল কাজে আমি আবেদার উৎসাহ দেখেছি। আমি যত দিন দেখেছি দুজনকে তখন তানভীরের দাড়ি ছিল না, আবেদার হিজাব ছিল না। তানভীর একটা মোবাইল কোম্পানির কাজ করত, পরে একটা ব্যাংকে। শুনেছি আবেদা এর মধ্যে হিজাব ধরেছে। সেখান থেকেই শুরু বোধ হয় ওদের নতুন দীক্ষা। বেহেশতে যাওয়ার প্রেরণা। যাকে আমি জানতাম একজন সৃজনশীল মনের মানুষ, এখন জানলাম আবেদা একজন ‘জঙ্গি’।

সময় এসেছে আমাদের উদ্‌ঘাটন করবার, আমাদের কাছের, চেনাজানা মানুষগুলোর কী করে সপরিবারে এ রকম পরিবর্তন হলো। ভাবছি, শুধুই ভাবছি। আমি ইশরাতকে দেখেছি, যে গুলশান হামলায় প্রাণ হারাল। আমি আবেদাকেও দেখেছি। যারা ইশরাতদের ছিনিয়ে নিল আমাদের কাছ থেকে। আমাদের অনেক কিছু করার আছে। সামনের দিনগুলো আরও ভয়াবহ যেন না হয়। ইশরাত, ফারাজ, অবিন্তা আর ক্লডিয়ারা আমাদের কিন্তু একটা সুযোগ করে দিল। আমরা কি সেটা কাজে লাগাতে পারছি? পারব?

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *